চরফ্যাশনে জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুহারা হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি

0
41
প্রতীকী ফাইল ছবি

এআর সোহেব চৌধুরী
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে চরফ্যাশন কেদ্রিক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বার বার সৃষ্টি হচ্ছে প্রাকৃতিক দূর্যোগ। বাড়ছে বন্যা-খড়া, জলোচ্ছ্বাস-টর্নেডো। পানিতে বাড়ছে লবনাক্ততা। এতে দিন দিন বাড়ছে বাস্তুহারার সংখ্যা। নানা দূর্যোগের শিকার হচ্ছেন এখানকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠি।

জানা যায়, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে এখানকার দরিদ্র মানুষগুলোর জীবন ও জীবিকা নির্বাহ ব্যয় অধিক হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু প্রবণ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। আর এ দেশের জলবায়ু পরিবর্তনে সবচে’ বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ভোলা জেলা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে গত ৪৫ বছরে তেঁতুলিয়া ও মেঘনার ভাঙনে জেলার ৫৭ কিলোমিটার এলাকা বিলিন হয়ে যায়। সেই সাথে লাখেরও বেশি মানুষ বাড়িঘর হারিয়েছেন। ঠিকানাহারা হয়েছে হাজারো মানুষ।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে সৃষ্ট দূর্যোগে বিগত বছরে চরফ্যাশন উপজেলার কৃষি ফসলের উৎপাদন হ্রাস,নদী ভাঙ্গণে হাজার,হাজার হেক্টর জমির বনসহ জীববৈচিত্র ধ্বংস হয়েছে অনেক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তুচ্যুত হওয়ার ফলে্ উপকূলের শিশুরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। নদী ভাঙনে শিশুরা শিক্ষার্জনের পরিবেশ হারাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গন থেকে ঝড়ে পড়ছে, নিজেদেরকে বিকশিত করতে পারছেনা, শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। নদী ভাঙনে ঢালচর, কুকরি-মুকরি, চরপাতিলাসহ উপকূলীয় বেশিরভাগ শিশুই জড়িয়ে পড়ছে মাছ ধরার মতো বৃত্তিমূলক কাজে।

নদী ভাঙনকবলিত ঢালচর থেকে শত শত পরিবার জাহানপুরের তুলাগাছিয়ায় আবাসন প্রকল্পে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলার প্রায় ৪০টি আবাসন প্রকল্পে ভাঙনকবলিত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রায় দুই হাজার দরিদ্র পরিবার বসবাস করছে। এসব পরিবারের অধিকাংশ নারীই ভুগছেন পুষ্টিহীনতাসহ শারীরিক নানান জটিলতায়। বয়স্ক পুরুষরাও অর্থনৈতিক, মানষিক, শারীরিক, স্বাস্থ্যহীনতায় পঙ্গু। এসব পরিবারের বেশিরভাগ আয়রোজগারকারী ব্যক্তিই জেলে ও কৃষি কাজে জড়িত।

এসব জেলে, কৃষকদের নেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে কোনো ধারণা। তাই নদ-নদী ও মাঠে-ঘাটে বন্যা, তুফান ও বজ্রপাতসহ নানান দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন তারা।

জেলে শিশু মো. সাদ্দাম হোসেন (১৩) পড়ালেখা করতো ঢালচরের একটি মাদ্রাসায়। নদী ভাঙনে সে পরিবারের সঙ্গে চর-ফকিরা আবাসনে বসবাস করছে। অভাব অনটনে তাঁর আর পড়ালেখা হয়নি।

একই ভাবে নদীভাঙনে ভিটামাটি হারিয়ে ঢালচর থেকে এসে জাহানপুরের তুলাগাছিয়া আবাসনে ঢুকেছে শিশু রুবেল (১২)। রুবেল জানায়, ঢালচরের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সে। নদী ভঙ্গনে পড়ালেখা ছেড়ে তাঁকে এ অঞ্চলে চলে আসতে হয়েছে। আর স্কুলে ভর্তি হতে পাড়েনি সে। বাবার সাথে নদীতে মাছ শিকারে যেতে হচ্ছে তাকে।

উপজেলার বেশির ভাগ আবাসন পুরোনো হয়ে যাওয়ায় নেই স্বাস্থ্যকর টয়লেট। এসব আবাসনের নারীদেরকে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে খাদ্য প্রস্তুত ও জ্বালানী লাকড়িসহ বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।

সচেতন মহলরে ধারণা জলবায়ু সম্পর্কিত সচেতনতার পাশাশি সংশ্লিষ্ট মহলকে সার্বিক বিষয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে আরও কাজ করতে হবে। তবেই উপজেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠি সমাজ ও সংস্কৃতির মূলধারায় অন্তর্ভূক্ত হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা জলবায়ু ফোরামের সভাপতি এম আবু সিদ্দিক বলেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এখানে শীত,গরম ও বর্ষার ভারসাম্য বলতে গেলে হারিয়ে গেছে। এছাড়াও কিছু এলাকায় নদী ভাঙন খুব বাড়ছে। এ অঞ্চলে বিগত বছরে অধিক বৃষ্টি, ঝড়, বন্যা, লবনাক্ততা, খরা ও টর্নেডোয় কৃষি, মৎস্য ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হয়েছে প্রান্তকি মানুষের।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে নাব্যতা হ্রাস ও ডুবচরের কারণে সমুদ্র থেকে মাছের ঝাক নদীতে আসতে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জেলেরা। যার প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনিতীতে। এছাড়া ঝড়-জলচ্ছাসে খামারি ও গৃহস্তের পুকুর জলাশয় এবং মাছের খামার ডুবে গিয়েও অনেক ক্ষতি হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তা আবু হাসনাইন বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে স্লুইস গেটগুলো দিয়ে জোয়ারে লবনাক্ত পানি প্রবেশ ও বর্ষায় অতিবৃষ্টির ফলে কৃষকদের ফসল উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।

বন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার ভাঙনে ঢালচরসহ কয়েকটি এলাকায় হাজার, হাজার হেক্টর জমির বনায়ন ও কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। এছাড়াও লবনাক্ত পানির কারণে ম্যানগ্রোভ বনের চারা মরে যাচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। জোয়ারে বন্যপ্রাণীর পছন্দ মিঠা পানির জলাশয়গুলো লবনাক্ত হয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা ত্রাণ ও প্রকল্প কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, আবাসনগুলোতে প্রায় ১৫ শ’ পরিবার বাস করছে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে পুরনো আবাসনের সংস্কার করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ভোলা-২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে নদী ও সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ভাঙনকবলিত এলাকার বেড়িবাঁধগুলোর উচ্চতা কিন্তু বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তাই ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে টেকসই ও উচ্চ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। আমরা উদ্যোগ নেবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here